‘লকডাউন’ শিথিলে বাড়বে করোনা সংক্রমণ

অনলাইন ডেস্ক :  করোনা আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দুই মাস কেটে গেলেও বাংলাদেশে সংক্রমণ থামছে না। প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে আরো অনেক নাম। যদিও বাংলাদেশে মৃত্যুর হার ইতালি, আমেরিকা বা অন্যান্য দেশের মতো নয়।

বাংলাদেশের জন্য মে মাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলা হলেও ‘লকডাউন’ শিথিল করার ফলে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বল্পসংখ্যক রোগীই ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে সংক্রমণ বাড়লে সবার চিকিৎসা দেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন তারা।

গত রোববার থেকে অঘোষিত ‘লকডাউন’ শিথিল করার ‘ঘোষণা’ দিয়েছে সরকার। ফলে অনেক স্থানেই হাট-বাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট খোলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, সবখানেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থায় শর্ত মেনে প্রতিষ্ঠান চালালেও করোনা সংক্রমণের সংখ্যা কমানো যাবে না। এরই মধ্যে খুলেছে শত শত পোশাক কারখানা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, ইফতার বেচাকেনা। ফলে সবখানে জনসমাগম বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনার ঝুঁকিও।

শিথিল অবস্থায় গেলে যে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে তা স্বীকার করেন সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও।স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, পোশাক কারখানা ও দোকানপাট খুলে গেলে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সংক্রমণ বাড়বে। করোনা বিষয়ক পরামর্শ কমিটিও এখনই ঢালাওভাবে দোকানপাট খুলে দেওয়ার পক্ষে নয়। আরো কয়েকদিন করোনা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে অন্তত ঈদের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত ছিল বলেই তাদের মত।

আবার সংক্রমণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অন্য দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যেমন ‘লকডাউন’ কার্যকর হয়েছে, আমাদের দেশে সেভাবে কার্যকর হয়নি। একটানা বেশিদিন লকডাউন পরিস্থিতি কার্যকর রাখাও সম্ভব নয়। ফলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মানুষের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। তাই সরকার সবদিক থেকে চিন্তাভাবনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ডা. লেনিন চৌধুরীবলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক নম্বর কৌশল হচ্ছে লকডাউন। কিন্তু বাংলাদেশে সরাসরি লকডাউন ঘোষণা না করে তেমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলেছে।

তিনি আরো বলেন, মূলত যে উদ্দেশে লকডাউন করা হয়েছিল, তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছিল না। যার ফলে করোনার সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছিল। হঠাৎ করে আমাদের নীতিনির্ধারকরা গাড়ির স্টিয়ারিং ভিন্নপথে ঘুরিয়ে দিল। অর্থাৎ যেভাবে লকডাউন পালন এবং শিথিল হওয়ার কথা, সে পথে না গিয়ে অঘোষিতভাবে লকডাউন তুলে দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা যারা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করি তারা গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি। এটা কোনো বৈজ্ঞানিক ধারাবাহিকতায় পড়ে না। যার ফলে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বাড়বে এবং তা ক্রমবর্ধমান থাকবে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, অচিরেই হয়তো তা ভেঙে পড়বে। দুঃখজনক হলেও আমাদের লাশের মিছিল দেখতে হবে।

বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, যতটা সাবধানতার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে লকডাউন তুলে নেওয়ার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে মানুষের স্বাস্থ্য কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। লকডাউন এক্সিট যথাযথ পরিকল্পনা মাফিক করতে পারলে ভালো হত। শপিং মল, মার্কেট আমরা ঈদের পর খোলার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন করোনার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তার দিকে চলে গেল। আমরা ধারণা করেছিলাম দেশে করোনা পরিস্থিতি মধ্য মে মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে, কিছুদিন পর আবার নিম্নমুখী হয়ে আস্তে আস্তে কমে যাবে। তবে এখন সংক্রমণের আশঙ্কা আবারও বেড়ে গেল। অন্যদিকে আবার আমাদের প্রস্তুতিও নেই সে অনুযায়ী।

দেশের অন্যতম ভাইরোলজিস্ট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রেসারের কারণে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। এর ফলে করোনা পরিস্থিতি কোন অবস্থায় যায়, সেটা আমরা ১৪-১৫ দিন পর বুঝতে পারব। তখন যদি সংক্রমণের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে না যায়, তাহলে সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলবে, সংক্রমণ যদি অনেক বেড়ে যায় তাহলে পুনরায় লকডাউনের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হবে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেলে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে কি-না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের সক্ষমতা কতটুকু সেটা সরকার ভালো করেই জানে। আমরাও সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি চিকিৎসার সামর্থ্য বাড়ানোর জন্য। বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় বেডের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। চিকিৎসার মানও উন্নত করা হচ্ছে। এগুলো তো আর একদিনেই দ্রুত করে ফেলা সম্ভব নয়, কিছুটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোও নিয়োগের ব্যবস্থা চলছে। আমরাও সরকারকে প্রেশার দিচ্ছি এগুলো করতে। এখন সার্বিক দিক থেকে বিবেচনা করলে করোনা পরিস্থিতি খুব একটা খারাপ বলা যাবে না।

করোনা টেস্টের পরিমাণ প্রতিদিন আরো ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে সাবেক এ উপাচার্য আরো বলেন, করোনার পরিস্থিতির শুরুর দিকে সরকারের বিভিন্ন কাজের আমিও অনেক কঠিন সমালোচনা করেছিলাম। তবে এখন সরকার যেসব কাজ করছে করোনা প্রতিরোধে তা আন্তরিকতার সঙ্গেই করছে বলেই আমার মনে হচ্ছে।

সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি হেলথ বিশেষজ্ঞসহ চিকিৎসকরা সকলেই একটা বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, লকডাউন শিথিলের ফলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কোন পথে যাচ্ছে সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে।